বোশেখ পড়ার আগেই এবছর চল্লিশ ছুঁয়েছে পারদ। পথে বেরোলে হাঁসফাঁস অবস্থা। বাড়ি ফিরলেও রেহাই নেই। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটা ‌যে ঘুরছে, তা মালুম হচ্ছে না অনেক সময়ই। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো চরমে পৌঁছেছে আর্দ্রতা। ফলে বসেবসেই ঘেমে ‌যাচ্ছেন অনেকে। এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে একমাত্র উপায় এয়ার কন্ডিশনার। কিন্তু বললেই তো হল না। বাজার ঘুরে বেছে-বুছে একটা এসি কেনা কি চাড্ডিখানি ব্যাপার?

 

আরও পড়ুন: এসি তো কিনতে ‌যাচ্ছেন, কিন্তু জানেন কি এসির ক্ষমতা মাপা হয় কী করে? সেলসম্যান ভুলভাল বোঝাচ্ছে না তো?

 

এসি মেড ইজ়ি

ক্ষমতা বা ক্যাপাসিটি: এয়ার কন্ডিশনারের ক্ষমতা বাছাই করতে হয় ঘরের মাপের ওপর। ‌যে ঘরে এসিটি লাগানো হবে তার মেঝে বা ছাদের ক্ষেত্রফলের ওপর নির্ভর করে তার ক্ষমতা। ‌যদি আপনার ঘরের মাপ ১২০ থেকে ১৪০ বর্গফুট হয় তবে ১ টন এসি লাগালেই কাজ চলে ‌যাবে। ‌১৫০ থেকে ১৮০ বর্গফুট হলে লাগাতে হবে ১.৫ টন এসি। ১৮০ থেকে ২৪০ বর্গফুটের ঘরের জন্য দরকার ২ টন এসি। কিন্তু ঘর ‌যদি টপ ফ্লোরে হয়। বা একেরবারে দক্ষিণ বা পশ্চিম দিকের ঘর হয়, তবে হিসেব বদলে ‌যেতে পারে। সেক্ষেত্রে লাগাতে হতে পারে অতিরিক্ত ক্ষমতার এসি।

 

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষমতা: দিন দিন ‌যেভাবে গরম আর বিদ্যুতের বিল পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাতে এসির বিদ্যুৎ সাশ্রয় ক্ষমতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখন সমস্ত বৈদ্যুতিন পণ্যের গায়েই এনার্জি এফিসিয়েন্সি মার্ক থাকে। এক থেকে পাঁচ স্টার দিয়ে মাপা হয় এনার্জি এফিসিয়েনসি। এই মার্কিং ঠিক করে ব্যুরো অফ এনার্জি এফিসিয়েন্সি বা BEE. এসির গায়ে ‌যত বেশি স্টার থাকবে, সেই এসি তত কম বিদ্যুৎ খরচ করবে। একটি ফাইভ স্টার এসির থেকে একটি ওয়ান স্টার এসি প্রায় ৫০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ খরচ করে।

 

স্প্লিট এসি কিনবেন না উইন্ডো: এখন উইন্ডো এসির চল প্রায় উঠেই গিয়েছে। উইন্ডো এসির দাম কম হলেও তাতে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। ‌যেমন, উইন্ডো এসির হাওয়া গোটা ঘরে ছড়ায় না। উইন্ডো এসিতে আওয়াজ হয় ফলে ঘুমাতে অনেকের সমস্যা হয়। কখনো উইন্ডো এসি থেকে ছিটকে জল বা বরফ বেরোতে থাকে। কখনো এসি থেকেই চুঁইয়ে জল পড়ে ঘরের ভিতরে। ফলে রেস্ত থাকলে স্প্লিট এসি কেনাই ভাল।

 

দাম: এখন বাজারে ২৫-৩০ হাজার টাকায় ১ টন এসি পাওয়া ‌যায়, ১.৫ টন এসির দাম শুরু ৩৫ হাজার থেকে। তবে প্রতি স্টার রেটিং বৃদ্ধিতে ২,৫০০ টাকা করে বাড়ে এসির দাম। তার ওপর সাধারণ এসি থেকে ইনভার্টার এসির দাম ২০ শতাংশ প‌র্যন্ত বেশি হতে পারে।

 

এয়ার কোয়ালিটি: আপনার এলাকায় বা‌য়ুদূষণের হাল কেমন বুঝে এসি কেনা উচিত। ‌যদি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার পরিমাণ খুব বেশি হয় তবে ভাল ফিল্টারওয়ালা এসি কেনা উচিত। ভাল ফিল্টার শুধু ধুলো দূর করে না, এসির কুলিং ক্ষমতাও বাড়ায়।

 

ইন্সটলেশন: উইন্ডো এসিতে একটাই ইউনিট তাই জায়গা অনেক কম লাগে। কিন্ত স্প্লিট এসিতে ঘরের ভিতরে ও বাইরে দু’টো ইউনিট থাকে। ফলে অনেক বেশি জায়গার প্রয়োজন হয়। ‌তাছাড়া স্প্লিট এসির কমপ্রেসর ইউনিট কী ভাবে লাগানো হচ্ছে তার ওপরেও তার এফিসিয়েন্সি নির্ভর করে। দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে ‌যেখানে সারাদিন রোদ পড়ে বা বদ্ধ জায়গা ‌যেখানে হাওয়া খেলে না, এমন জায়গায় কমপ্রেসর ইউনিট লাগালে বিদ্যুতের বিল আসতে পারে কয়েক গুণ।

 

মেরামতি: গাড়ির মতো এসিও নিয়মিত মেরামত করতে হয়। নইলে ভয়ঙ্কর সব কাণ্ড ঘটতে পারে। এসি মেরামতিতে গাফিলতির জন্য প্রতি বছর প্রচুর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাছাড়া স্প্লিট এসির কমপ্রেসর ইউনিটে নিয়মিত নজরদারি করা উচিত। কোনও অস্বাভাবিক শব্দ ও কম্পন অনুভব করলেই খবর দেওয়া উচিত সার্ভিস পার্সনকে।

 

আফটার সেলস সার্ভিস: ‌যে কোনও বৈদ্যুতিন পণ্যের জন্যই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আর এসির জন্য তো বটেই। ‌যে ব্র্যান্ডের এসি কিনছেন আপনার এলাকায় তার পরিষেবার রেকর্ড কেমন জেনে নিন আগে থেকে। জেনে নিন তার জন্য খরচপাতি। নইলে পরে ফাঁপড়ে পড়তে পারেন।

 

অন্যান্য ফিচার: অধিকাংশ এয়ার কন্ডিশনারেই ডিহিউমিডিফিকেশন ফাংশন থাকে। এই ফিচারটি বাতাসের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ঘরের পরিবেশ আরও আরামদায়ক হয়ে ওঠে। এসিটিতে কতটা আওয়াজ হয় সেটাও দেখে নেওয়া দরকারি। সাধারণত ১৯ থেকে ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে ঘোরাফেরা করে এই পরিসংখ্যান। এসিতে স্লিপ মোড ফিচারটিও বেশ কা‌র্যকরী। এতে রাতে ঘর খুব ঠান্ডা হয়ে ‌যাওয়ার সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া ‌যায়। এছাড়া অটো রিস্টার্স্ট ফিচারটিও কা‌র্যকরী। এই ফিচার থাকলে লোডশেডিংয়ের পর ফের কারেন্ট এলে এসি নিজে থেকেই আগের সেটআপে চলতে শুরু করে দেয়। ফলে বার বার এসি সেট করার ঝামেলা থেকে মুক্তি মেলে।

 

শেষ কথা: এসি কেনার সব থেকে বড় সমস্যা হল টনেজ, এফিসিয়েন্সি ও দামকে ব্যালেন্স করা। ছোট্ট একটা ঘরের জন্য অহেতুক একটা দেড় বা দু’টন এসি কেনা জাস্ট টাকার অপচয়। সেজন্য একটা রূপরেখা ছকে দেওয়া রইল। এটা ধরে এগোতে পারেন।

‌যদি বছরে ৩ বা ৪ মাস দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এসি চালান তাহলে থ্রি স্টার রেটেড এসিই ‌যথেষ্ট। ‌যদি আপনার এলাকায় ৫ থেকে ৭ মাস এসি চালাতে হয় তবে ৫ স্টার রেটেড এসি কেনাই ভাল। আর ‌যদি সারা বছরই থাকেন এসির ভরসায় তবে কড়ি খসিয়ে কিনতে হবে একটা ইনভার্টার এসি।

 

সব কিছু শিখে গেলেন, এবার ময়দানে নেমে পড়ুন। আরও কোনও প্রশ্ন থাকতে করতে পারেন কমেন্ট সেকশনে।